মঙ্গলবার, ১৮ Jun ২০২৪, ০৩:০০ অপরাহ্ন

নির্বাচনী সহিংসতা : ডিমলায় গ্রেপ্তার আতঙ্কে পুরুষ শূন্য গ্রাম

নির্বাচনী সহিংসতা : ডিমলায় গ্রেপ্তার আতঙ্কে পুরুষ শূন্য গ্রাম

জামান মৃধা, ডিমলা (নীলফামারী)

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় টেপাখরিবাড়ি ইউনিয়নের পন্ডিত পাড়া গ্রামে গত ১৭ই জুলাই সোমবার ইউপি নির্বাচনে সহিংসতাকে কেন্দ্র করে সাধারণ সদস্য পদপ্রার্থী (বৈদ্যুতিক পাখা) ফেরদৌস মিয়ার সমর্থকদের ও পুলিশ, বিজিবি, আনসার ভিডিপি সদস্যদের মধ্যেকার সংঘর্ষের ঘটনায় বিজিবি”র নায়েব সুবেদার নজরুল ইসলাম গত ১৮/৭/২৩ ইং তারিখ ডিমলা থানায় বাদী হয়ে ২১জন নামীয় এবং অজ্ঞাত ৩০০/৪০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করায় পুলিশের গ্রেফতার আতঙ্কে পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে মুন্সিপাড়া গ্রামটি। ২১শে জুলাই শুক্রবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সংঘর্ষের পর থেকে গ্রামের বাসিন্দারা গ্রেপ্তার আতঙ্কে বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন গ্রেফতারের ভয়ে। দিনের বেলায় হাতেগোনা কয়েকজন বয়-বৃদ্ধ ও ছোট ছেলেদের দেখা গেলেও রাতে সে সংখ্যা নেমে আসে শূন্যের কোঠায়। বর্তমানে গ্রামের বেশিরভাগ বাড়িতে নারী ও শিশুরাই শুধু অবস্থান করছেন। তাদের চোখে-মুখেও রয়েছে আতঙ্কের ছাপ।

 

এলাকা জুড়ে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। মহিলারাও গ্রেফতার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। ভোট কেন্দ্রের পার্শ্ববর্তী মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায় হয়েছে ঠিকই কিন্তু গ্রেফতার আতঙ্কে মুসল্লিদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। এছাড়া দক্ষিণ খড়িবাড়ি পন্ডিত পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর উপস্থিতিও কম। আর তাতে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান কার্যক্রম। এছাড়াও ইউপি কার্যালয়ের পার্শ্ববর্তী এলাকায় ছোট একটি বাজার থাকলেও ১৭ই জুলাই নির্বাচনের পর থেকে এখন পর্যন্ত বন্ধ রয়েছে সকল দোকানপাট। বর্তমানে গ্রামটি একেবারে পুরুষ শূন্য অবস্থায় রয়েছে। ঐ গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দ আব্দুস সুবহান জানান, ভাই ভোট দিয়া আইসা আমি বাড়িতে ছিলাম কিন্তু এখন দেখি অবস্থা খুবই গরম। গ্রামের অনেক লোক বাড়িঘর ছ্যাইড়া অন্য জায়গায় চইলা গেছে। এখানে অনেক পরিবারের ঘরের বাজার পর্যন্ত বন্ধ, পুরুষ না থাকার কারণে গ্রামের অনেক লোক অসহনীয় কষ্টে জীবন যাপন করতাছে। স্থানীয় বিলকিস বেগম জানান, আমার স্বামী চাল বিক্রী করে সংসার চালায় সে বাড়িতে না থাকায় আমরা নিদারুণ কষ্টে আছি। দেখেন আমাদের বাড়িতে ডায়াবেটিসের রোগী রয়েছে। ইতিমধ্যে তার দুই পায়ের দুটি আঙ্গুল কেটে ফেলা হয়েছে। এখন সে গুরুতর অসুস্থ বিছানায় পড়ে আছে। কোন ঔষধ পত্র নেই। সে এখন মৃত্যু পথযাত্রী। ওই গ্রামের আরো একজন স্থানীয় বাসিন্দা জুলহাস মিয়া জানান এই গ্রামটি এখন সম্পূর্ণ পুরুষ শূণ্য, কাউকেই বাড়িতে পাবেন না। কারো বাড়িতে বাজার সদাই নেই, অনেক পরিবার অসহনীয় অবস্থায় দিনাতিপাত করছে। আমার বাড়ীতে ছয়জন পুরুষ আমি ছাড়া একজন ও নেই। স্থানীয় সুধীমহলের দাবী, নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনায় শুধু মাত্র যারাই অভিযুক্ত যাদের ভিডিও ফুটেজ রয়েছে তাদেরকেই আইনের আওতায় আনা হোক অযথা নির্দোষ, নিরিহ ব্যক্তিরা যেন হয়রানির স্বীকার না হয়। এবিষয়ে কথা হয় গ্রেফতারকৃত তাসিন ইসলামের পিতা রফিকুল ইসলামের সাথে তিনি জানান, পার্শ্ববর্তী ইউনিয়নের শুটিবাড়ী বাজারে আমরা তুষার পান স্টোর নামে একটা পানের দোকান করি।

রাত ২-৩ টা পর্যন্ত খোলা থাকে দোকান। সেদিনও খোলা ছিল। দোকান দুইটার দিকে বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে টেপাখড়িবাড়ি পরিষদ বাজার এলাকা থেকে আমার ছেলেকে পুলিশ তুলে নিয়ে যান। রাতে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও কোনো সারা পাওয়া না গেলে বিভিন্ন যায়গায় খোজখবর নেওয়া পর মঙ্গলবার সকালে জানতে পারি পরিষদে মারামারির ঘটনায় তাসিনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু সন্ধ্যায় মারামারির সময় তাসিন দোকানে বেচাকেনায় ব্যস্ত ছিল। ওই ছোট পানের দোকানে আমার পরিবারের দশজনের সংসার চলে। ছেলে গ্রেপ্তারের দুশ্চিন্তায় আমি দুইদিন থেকে দোকান খুলতে পারছি না। আমার ছেলে নির্দোষ তাকে মুক্তি দেওয়া হোক এটা আমার দাবী। কথা হয় আরেকজন ভুক্তোভুগী ফজল মিয়া ওরফে রানা মিয়ার মা ফাতেমা বেগমের সাথে তিনি জানান, আমার পোলা রানা সে দোকান পাট বন্ধ কইরা বাড়ি আইবার নইছিলো, কিন্তু পুলিশরা নাহি তারে রাস্তা থাইকা তুইলা নিয়া গেছে! কিন্তু আমার পোলা তো সারাটা দিন শুটিবাড়ির দোকানে ছিল হেই তো কিছু জানতো না, তারপরও আমার পোলাটারে নিয়া গেল! আমরা এহন কি করুম? আমার পোলডারে আইনা দেও-না-গো বাজান। হের আয়-রোজগারে আমাগো পরিবার চলে, আমার বাপজান নির্দোষ। আমার বাপজানের মুক্তি চাই। ডিমলা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) লাইছুর রহমান বলেন, সংঘর্ষের এলাকায় অভিযান চালিয়ে আমরা এ পর্যন্ত আব্দুল করিম (৪০), তাসিন (২৩), রবিউল ইসলাম (৩০), কামিনুর রহমান (৩৪), ফজল মিয়া রানা (৩৫), মো. মাসিদুল ইসলাম (৩০), মো. হাবিব (৩০), মো. ফরহাদ আলী (৩৫), মো. হাবিবুর রহমান হাবু (৩০), মো. আনিসুর রহমান (৩৩), মো. আবু জাহিদ (৩৮) নামের এই ১১ জনকে গ্রেফতার করে আদালতে প্রেরণ করেছি। বাকিদের গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

 

তবে নিরপরাধ কাউকে হয়রানি বা গ্রেফতার করা হবে না। ডিমলা থানা সূত্রে জানা যায়, গত ১৭ই জুলাই ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের দক্ষিণ খড়িবাড়ি পন্ডিত পাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোট কেন্দ্রে ভোট গণনা শেষে সন্ধ্যা ৭টায় কেন্দ্রে ফলাফল প্রকাশ করা হয়। ভোটের ফলাফলে অসন্তুষ্ট হয়ে সাধারণ ওয়ার্ড সদস্য পদপ্রার্থী ফেরদৌস মিয়ার সমর্থকেরা বিজিবি, পুলিশ ও আনসার ভিডিপি সদস্যদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এ সময় ফেরদৌস মিয়ার সমর্থকেরা আইন শৃঙ্খলার কাজে নিয়োজিত ছয়টি গাড়িও ভাঙচুর করে। এ অতর্কিত হামলায় কয়েকজন বিজিবি ও পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। অনেক চেষ্টার পর বিজিবি ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনী উত্তপ্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2024 Rangpurtimes24.Com
Developed BY Rafi IT