সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ১০:২৪ পূর্বাহ্ন

একাত্তরের বীরাঙ্গনাদের আর্তনাদ ফুটে উঠল গার্ডিয়ানের পাতায়

একাত্তরের বীরাঙ্গনাদের আর্তনাদ ফুটে উঠল গার্ডিয়ানের পাতায়

ফারাজী আজমল হোসেন:
মুক্তিযুদ্ধের ৫২ বছর পরেও একাত্তরের বীরাঙ্গনারা পাকিস্তান সেনার ভয়ঙ্কর অত্যাচারের কথা ভুলতে পারছেন না। ভুলতে পারা সম্ভবও নয়। সেই পাকিস্তানি সেনাদের ধর্ষণের শিকার নারীরা ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানকেও শুনিয়েছেন তাদের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা। তাদের কথায়, ‘আমরা লাশের মতো শুয়ে ছিলাম। তারপর শুরু হয় ধর্ষণ’। ১৯৭১ সালের ধর্ষিতাদের ওপর পাকিস্তানের সৈন্যদের নির্মম অত্যাচারের বিবরণ শুনে স্তম্ভিত গোটা দুনিয়া।

বীরাঙ্গনা নূর জাহান দ্য গার্ডিয়ানকে শুনিয়েছেন খান সেনার পাশবিক নৃশংসতার কথা। তার বক্তব্য অনুসারে, ১৯৭১ সালের গ্রীষ্মকাল। কয়েক মাস আগেই শুরু হয়েছে যুদ্ধ। রাজশাহীতে পদ্মানদীর উত্তর তীরে ১৪ বছর বয়সী বোনের সঙ্গে উঠোনে খেলছিলেন তিনি। সেইসময় সেনা বাহিনীর একটি ট্রাক এসে কর্কশ শব্দে থামে। তারপর তাদের দুই বোনকে নিক্ষেপ করা হয় সেই ট্রাকে।

বাংলাদেশ গার্ল গাইড অ্যাসোসিয়েশনের তৎকালীন সচিব মালেকা খানকে বীরাঙ্গনাদের পুনরুদ্ধারের জন্য মহিলা স্বেচ্ছাসেবকদের একত্রিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ঢাকার জাহাঙ্গীর গেটের কাছে আন্ডারগ্রাউন্ড বাঙ্কারে ধর্ষিতা ও বন্দী নারীদের দশা দেখে তার চোখেও পানি চলে আসে। এখন ৮০ বছরের বৃদ্ধা মালেকা জানান, ‘সেখানে নারীদের সম্পূর্ণ নগ্ন করে রাখা হয়েছিল। পরিত্যক্ত বাঙ্কারে যুদ্ধের সময় তাদের ধর্ষণ ও নির্যাতন করা হয়। অনেকে গর্ভবতীও ছিলেন’।

সেখানে পিঠমোড়া করে বাঁধা ছিল অন্য নারীরাও। সেই বীভৎসতার ছবি আজও স্পষ্ট মনে আছে ৬৫ বছরের নূর জাহানের। তিনি বলেন, ‘তারা আমাদের নিচের দিকে তাকিয়ে চুপ করে থাকতে বলেছিল। এরপর ট্রাকটি গবাদি পশুর মতো আরও নারীদের তুলতে তুলতে এগিয়ে যায়’। এত কম বয়সে নূর জাহানের সেই অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে এখনও ভয়ে কেঁপে ওঠেন তিনি। সে সময় তাদের কাঁদবার সাহসটুকুও যে ছিল না।

নূর জাহান বলেন, ‘আমাদের কোনো ধারণা ছিল না যে তারা আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। আমি আর চোখে দেখেছিলাম যে আমাদের চিরচেনা রাস্তা ধীরে ধীরে ধুলোয় মিশে যাচ্ছে। আমি আমার বোনের হাত শক্ত করে ধরেছিলাম এবং পুরো সময় ভয়ে কাঁপছিলাম। আমরা সবাই বাংলার কসাই (পাকিস্তানের সামরিক কমান্ডার জেনারেল টিক্কা খানকে দেওয়া ডাকনাম) ও তাদের লোকদের কথা শুনেছি। এখন মনে হচ্ছে তাদের পাল্লাই পড়েছি।’।

পাকিস্তানের সেনা কমান্ডার জেনারেল টিক্কা খানকে বাংলার কসাই বলা হতো। অপারেশন সার্চলাইট বা পরবর্তীতে বাঙালী জাতির গণহত্যাকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য কুখ্যাত ছিলেন তিনি। নূর জাহান বুঝতে পেরেছিলেন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংস কৌশলের শিকার হতে চলেছেন তারা। কারণ হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি পাকিস্তানি সৈন্যরা বাঙালি নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ ধর্ষণ চালিয়েছে। গার্ডিয়ানের মতে, ইতিহাসবিদরাও বিশ্বাস করেন যে টিক্কা খানের নির্দেশে ‘পশ্চিম পাকিস্তান থেকে রক্ত’ দিয়ে যতটা সম্ভব নারীদের গর্ভধারণ করা ছিল সরকারি নীতি।

নূর জাহান জানান, ট্রাক তাদের সেনা ব্যারাকে নিয়ে আসা হয়। তারপর শুরু হয় সঙ্ঘবদ্ধ ধর্ষণ। তার কথায়, ‘একটি ঘরে আমরা সম্ভবত ৩০ জন লাশের মতো শুয়ে ছিলাম’।– কথাগুলো বলতে গিয়ে চোখে পানি চলে আসে তার। বলেন, ‘দরজা খুলে খান সেনারা যখন ছাউনির ভিতর ঢোকে তখনই শুধু দিনের আলো দেখেছিলাম আমরা। তারপরই শুরু হয় ধর্ষণ’।

দ্য গার্ডিয়ানের বিবরণ অনুযায়ী, পাকিস্তানি সেনাদের তৈরি এমন ধর্ষণ শিবির সারা দেশেই তৈরি করা হয়েছিল। ২ থেকে ৪ লাখ বাঙালি নারী ধর্ষিতা হন এ শিবিরগুলোতে ও শিবিরের বাহিরে। ধর্ষণকেও গণহত্যায় ‘সচেতনভাবে প্রয়োগ করা অস্ত্র’ হিসাবে ব্যবহার করেছিল পাকিস্তান।

ধর্ষিতারা অনেকেই তাদের ক্ষত গোপন রেখেছিলেন। লোকচক্ষুর পাশাপাশি কাজ করেছিল সমাজে একঘরে হওয়ার ভয়ও। ঢাকায় অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের দেয়ালের সাম্প্রতিক একটি ফলককেও উদ্ধৃত করেছে গার্ডিয়ান। তাতে লেখা , ‘এই লুকানো কষ্টের খুব বেশি রেকর্ড নেই’। তবুও বাংলাদেশের প্রতিটি কোণে, ভয়ঙ্কর সাক্ষ্য নিয়ে বেঁচে আছেন বীরাঙ্গনারা।

যেমন রাজিয়া বেগম। ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে তিনি নিখোঁজ স্বামী আবু সরকারকে খুঁজতে বেরিয়েছিলেন। মাথায় রাইফেলের ঘা মেরে ঢাকা থেকেই তাকে তুলে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সেনা। সেই দাগ রয়েছে আজও। রাজিয়া বেগমকে একটি জঙ্গলে টেনে নিয়ে গিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে বারবার ধর্ষণ করা হয়। দ্য গার্ডিয়ানকে তিনি বলেন, ‘তারা আমাকে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখেছিল। তারপর তাদের বিরতির সময় এসে আমাকে পালাক্রমে ধর্ষণ করতো’।

কয়েক সপ্তাহ ধরে সঙ্ঘবদ্ধ ধর্ষণের পর তাকে একটি অগভীর খাদে ফেলে দেয়। রাজিয়া বেগমের এখন বয়স ৭৮। ধর্ষণের পর তার ঠাঁই হয় আশ্রয়কেন্দ্রে। ধর্ষিতা ও সমাজ পরিত্যক্ত নারীদের নিয়ে এমন আশ্রয়কেন্দ্রে ভরে গিয়েছিল বাংলাদেশ।

রাজিয়া বেগম আরও বলেন, ‘সেই সময়ে নারীদের বাহিরে বের হওয়ার তেমন চল ছিল না। তাই আমরা অনেকেই আমাদের সঠিক ঠিকানাও জানতাম না’। তিনি বলেন, ‘যা হয়েছে তা নিয়ে ভাবতে আমার ভালো লাগে না। কিন্তু এত বছর পরেও আমার পক্ষে ভুলে যাওয়াও কঠিন। আমার এখনও সব দুঃস্বপ্নের মতো মনে হয়’। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর, যুদ্ধ আকস্মিকভাবে শেষ হয়। নূর জাহান ও রাজিয়া বেগমের মতো হাজার হাজার বাঙালি নারী ভেবেছিলেন, তাদের আশ্রয়কেন্দ্র ও ধর্ষণ শিবির থেকে উদ্ধার করা হবে।

বাংলাদেশ গার্ল গাইড অ্যাসোসিয়েশনের তৎকালীন সচিব মালেকা খানকে বীরাঙ্গনাদের পুনরুদ্ধারের জন্য মহিলা স্বেচ্ছাসেবকদের একত্রিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ঢাকার জাহাঙ্গীর গেটের কাছে আন্ডারগ্রাউন্ড বাঙ্কারে ধর্ষিতা ও বন্দী নারীদের দশা দেখে তার চোখেও পানি চলে আসে। এখন ৮০ বছরের বৃদ্ধা মালেকা জানান, ‘সেখানে নারীদের সম্পূর্ণ নগ্ন করে রাখা হয়েছিল। পরিত্যক্ত বাঙ্কারে যুদ্ধের সময় তাদের ধর্ষণ ও নির্যাতন করা হয়। অনেকে গর্ভবতীও ছিলেন’।

ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিদের সমাজে ফিরিয়ে আনার প্রয়াসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাদের বীরাঙ্গনা সম্মান প্রদান করেছিলেন। তাদের জন্য পুনর্বাসন কর্মসূচিও ঘোষণা করেছিলেন। সেই কর্মসূচির নির্বাহী পরিচালক ছিলেন মালেকা খান। তিনি আরও জানান, ‘বেঁচে যাওয়াদের জন্য আশ্রয়, মনোবিদদের পরামর্শ এবং প্রশিক্ষণ প্রদানই ছিল পুনর্বাসন কর্মসূচির উদ্দেশ্য। অবাঞ্ছিত গর্ভধারণ মোকাবেলা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল চিকিৎসকদের’।

পরবর্তীতে গর্ভপাতের অনুমতি দেওয়ার জন্য অস্থায়ী আইন এবং তাদের ঘরে জন্ম নেওয়া শিশুদের জন্য একটি আন্তর্জাতিক দত্তক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। গর্ভপাত বিশেষজ্ঞ অস্ট্রেলিয়ান ডাক্তার জিওফ্রে ডেভিসকে উচ্চ-ঝুঁকির প্রক্রিয়াগুলি তত্ত্বাবধানের জন্য আনা হয়েছিল। মারা যাওয়ার আগে তিনি ২০০৮ সালে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক বিনা ডি’কস্তাকে শেষ সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, ‘তারা পদাতিক বাহিনীকে পিছনে রাখতো এবং আর্টিলারিকে এগিয়ে দিতো।

হাসপাতাল এবং স্কুলগুলিতে চলতো গোলাগুলি। আর তাতেই শহরে শুরু হতো বিশৃঙ্খলা এবং তারপর পদাতিক বাহিনী নারীদের ভোগ করার জন্য শুরু করতো অপহরণ’। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি নাট্যকার লীসা গাজীর পুরস্কার বিজয়ী তথ্যচিত্র রাইজিং সাইলেন্স-এর প্রশংসা করা হয়। এই তথ্যচিত্রে বীরাঙ্গনাদের অনেকেরই সাক্ষাতকার ধারণ করা হয়েছে।

তথ্যচিত্রে গাজী নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করেন, ‘নারীর শরীর কীভাবে এত ঘৃণা ও সহিংসতা জাগাতে পারে? যদি আমাদের একটি পরিবারকে লজ্জা দিতে হয়, আমরা তাদের মেয়েদের আঘাত করি। কোনো দেশকে লজ্জিত করতে প্রয়োজন হলে আমরা তাদের মেয়েদের আক্রমণ করি। এটা সেই একই বিকৃতি’।

যুদ্ধে যৌন সহিংসতার বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ১৮টি দেশকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, যেখানে যুদ্ধে নারীরা ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তালিকায় ১২টি সেনা ও পুলিশ বাহিনী এবং ৩৯ টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। বাংলাদেশে নারীর অধিকারের লড়াইয়ে নেতৃত্বদানকারী নারীপক্ষ-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা শিরীন হকের মতে, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বারবার অপরাধীদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে ব্যর্থতার অর্থ হল এই জঘন্য কাজগুলো দায়মুক্তির সঙ্গে অব্যাহত রয়েছে’।

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনিম বলেছেন, ‘৫২ বছর হয়ে গেছে এবং আমরা এখনও পাকিস্তানকে বাঙালি জনগণের বিরুদ্ধে সংঘটিত জঘন্য যুদ্ধাপরাধের জন্য ক্ষমা চাইতে শুনিনি’।

বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই লেমকিন ইনস্টিটিউট ফর জেনোসাইড প্রিভেনশন অ্যান্ড জেনোসাইড ওয়াচ থেকে গণহত্যার স্বীকৃতি পেতে সফল হয়েছে এবং মার্কিন কংগ্রেস সম্প্রতি ১৯৭১ সালে গণহত্যা হয়েছে বলে স্বীকৃতি দিতে একটি ঐতিহাসিক রেজুলেশন পেশ করেছে। তাতে বলা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল। যুক্তরাজ্যের অত্যন্ত জনপ্রিয় গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনেও উঠে এলো পাকিস্তান সেনার নৃশংস গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের সেই বিবরণ।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2024 Rangpurtimes24.Com
Developed BY Rafi IT